অভিধানের ভাষায় “চিঠির” সংজ্ঞা, “কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে প্রেরিত লিখিত বার্তা” হলেও আমার কাছে চিঠির মানে ভিন্ন। সামনে বসে যেসব কথা বলা যায় না সেই কথাগুলো নিজের মনের ডালপালা মেলে দিয়ে রঙীন সাজে সাজিয়ে মনের ভাব অন্যকে জানানো হয় চিঠিতে। কখনও কখনও আবার চিঠির মাধ্যমে অভিযোগ অনুযোগ মান অভিমানও প্রকাশ করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে চিঠি লেখা যেনো হারিয়েই যাচ্ছে সবাই মোবাইল টেক্সট ম্যাসেজ, ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেঞ্জার, ইমেইল ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত তাদের বার্তা প্রাপকের কাছে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান। কিন্তু তারপরও হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ রয়ে গেছেন যারা এখনও হাতে চিঠি লিখতে অসম্ভব ভালোবাসেন। আমি তাদের মধ্যে একজন। নিয়মিত চিঠি লিখতে না পারলেও মাসে একবার চিঠি লেখা তো হয়ই।
ছোটবেলায় যখন বাংলা দ্বিতীয় পত্রের জন্য “বাবার কাছ থেকে টাকা চেয়ে চিঠি” অথবা “বিদেশে অবস্থানরত পত্রমিতালীকে চিঠি” লিখতে হতো তখন চোখে অন্ধকার দেখতাম সাথে চিঠি লেখার উপর বড়ই বিরক্তির উদ্রেক হতো। কিন্তু আমি বরাবরই একটু ভাবুক প্রকৃতির তাই মনে মনে আকাশ কুসুম অনেক কিছু ভাবতে ভালো লাগতো, দেখা যেতো এরকম আকাশ কুসুম ভাবতে ভাবতেই চিঠি লিখে ফেলেছি কাউকে। মনে মনে চিঠি লেখাটা হতো বেশি যখন বাবা মা অথবা বোনদের কারো উপর প্রচন্ড রাগ উঠলে রাগারাগি কান্নাকাটির পর।
যতো বড় হয়েছি স্বাভাবিকভাবেই এমন ভাবুক হয়ে বসে থাকা এমন মনে মনে চিঠি লেখা ধীরে ধীরে কমে আসতে আসতে প্রায় নাই হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে আমার মাঝে আবারও চিঠি লেখার বাতিক জাগিয়ে দিলো আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
একদিন হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে আমাকে বললো
“একটা জিনিস চাবো কিন্তু তুমি হাসতে পারবে না”,
আমি: “শুনি কি জিনিস চাও”
সে: “আগে বলো দিবে? আর শুনে হাসবে না?”
আমি বরাবরই একটু হেয়ালি করি এবারও হেয়ালি করে বললাম
“বারে দিবো না কেনো? তবে চাঁদ সূর্য তারা চেতে পারবা না আমি এখন মহাকাশে যেতে পারবো না। আমার দেয়ার সামর্থ আছে এমন জিনিস চেতে হবে?”
সে: “ধুর ফাইজলামী না, এটা তোমার দেয়ার সামর্থের মধ্যেই আছে তবে হাসবে না”
আমি: “আচ্ছা ঠিক আছে বলো হাসবো না”
সে: “তুমি কি আমাকে চিঠি লিখবে? আমার খুব ইচ্ছা যে আমাকে ভালোবাসবে সে আমাকে দেখা হলেই একটা করে চিঠি দিবে, বিয়ের পরও দিবে। জানি এসএমএস, ইমেইলে তাড়াতাড়ি আসবে কথা কিন্তু তারপরও চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে যে আনন্দ তা আমি পেতে চাই। অপেক্ষা করতে চাই তোমার চিঠির, তোমার মতো তোমার চিঠিকে ভালোবাসতে চাই।”
আমি গম্ভীর হয়ে: “হুমম লিখবো”
সে: “তোমার লিখতে ভালো না লাগলে লেখার দরকার নেই, আমি বলছি বলেও লেখার দরকার নেই। তোমার মন চাইলেই কেবল লিখবে”
আমি: “আমার নিজেরই লিখতে ভালো লাগবে, আগে শখ ছিলো লেখার ছোটবেলায় ডায়েরী লিখতাম। বদলে এখন নাহয় তোমাকেই চিঠি লিখবো”
সে উচ্ছ্বসিত হয়ে: “সত্যি?”
আমি: “হুমম সত্যি”
সে: “উফফফ! তুমি অনেক ভালো”
তারপর কিছুক্ষণ আমরা কথা বলি কিভাবে চিঠি লিখবো কি লিখবো এসব নিয়ে। সেসব বলে পাঠকদের বিরক্তির উদ্রেক করবোনা।
যাই হোক সেই থেকে এখন পর্যন্ত যখনই সময় পাই তখনই চিঠি লিখি আমার প্রিয় মানুষটাকে। আমার প্রিয় মানুষটাও আমাকে চিঠি লেখে বরং আমার চেয়ে অনেক বেশিই লেকে বেশ বড় সড় করে। ও প্রায়ই আমার কাছে অভিযোগ করে যে আমি ওকে নিয়মিত চিঠি দেই না অথবা খুব অল্প কয়েকটা কথা লিখি। আমার খুব বেশি দোষ নেই বেশিরভাগ সময় কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বসে দেখা যায় আমি মনে মনে বিশাল বড় চিঠি লিখে ফেলেছি কিন্তু বাস্তবে কাগজে কলমে খুব সামান্যই লেখা হয়েছে, একারণে আফসোস হয় কেনো এখনও মনের ভাষা বুঝে নিজে নিজে লিখে ফেলার প্রযুক্তি এখনও আবিস্কার হয়নি (অথবা বাজারে নেই কেনো)। থাকলে আমার খুব সুবিধা হতো।
(আবারও কেবল নিজের কথায় চলে যাচ্ছি)।
যারা কখনও চিঠি লিখেননি তারা অন্তত একবার চিঠি লিখুন প্রিয় কোন মানুষকে, যাদের ভালোবাসার মানুষ আছেন তারা ভালোবাসার মানুষকে চিঠি লিখুন। এটা বাধ্যতামূলক না যে আপনি ভালোবাসায় ভরা চিঠি লিখবেন, সারাদিনে অনেক কিছুই তো দেখেন তার থেকে একটা মজার জিনিস নিয়েই নাহয় লিখুন, অথবা মন খারাপের কথাই জানান প্রিয় মানুষটাকে। অনেক কথাই হয়তো সামনে বসে বলতে পারবেন না মনের কোণে জমে থাকে, সেই কথাগুলোই নাহয় চিঠিতে জানান। ভালোবাসার মানুষের চিঠি হাতে পেলে কেমন লাগে তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয় কেবল অনুভব করাই সম্ভব। হয়তো বলবেন এসএমএস, ইমেইল থাকতে কেনো চিঠি লিখবো? এসএমএসে সব কথা বলা যায় না, ইমেইল চিঠির মতো হলেও চিঠি লিখার সময় মনের ডালা যেমন মেলে দেয়া যায় কম্পিউটারের মনিটরের সামনে বসে মনের ডালাটা সেভাবে খুলে দেয়া যায় না। তাই অন্তত একবার হলেও চিঠি লিখুন।
শেষ করার আগে আমার প্রিয় একটা গান তুলে দিলাম পাঠকদের জন্য, এই গানটা মনে গুনগুন করছিলো বলেই এই লেখার অবতারনা (সাথে আমার প্রিয় মানুষটার জন্যও লেখা)। গানের কথা রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্-র, বলা হয়ে থাকে মৃত্যুর আগে তার স্ত্রীকে দেয়া এটাই তার শেষ চিঠি। গানটি ছোটবেলায় একটা নাটকে শুনেছিলাম নাটকের নাম এখন আর মনে নেই বিটিভিতে হতো, এই গানটা টাইটেল সং হিসেবে ছিলো।
গানটি শুনুন (খালি একোস্টিক গিটার বাজিয়ে গাওয়া, আর ভিডিওতে গায়ক কিন্তু আমি নই আমাকে দাবড়ানি দিয়েন না)
গানের কথা:
ভাল আছি, ভালো থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো॥
দিও তোমার মালাখানি,
বাউলের এই মনটা রে।
আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে॥
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক,
খোলসের আবরনে মুক্তর সুখ॥
তেমনি তোমার নিবিড় ছোঁয়া॥
হৃদয়ের নীল বন্দরে।
আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে॥
ভাল আছি, ভালো থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো॥
দিও তোমার মালাখানি,
বাউলের এই মনটা রে।
আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে॥
ঢেকে রাখে যেমন কুসুম,
পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম॥
তেমনি তোমার নিবিড় চলা
মরমের মূল পথ ধরে।
আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।
ভাল আছি, ভালো থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো॥
দিও তোমার মালাখানি,
বাউলের এই মনটা রে।
প্রথম যেদিন তোমার চিঠি হাতে পাই সেদিনের অনুভূতি আজও আমি পাই, তোমার পুরানো চিঠি হাতে নিলেও আমি মাঝে মাঝে কেঁপে উঠি। তোমার চিঠি পেলে আগে আমি তোমার গায়ের গন্ধ নেই তারপর খুলি…
খুলে আমি অবাক হই… আমি সিক্ত হই… আমি রিক্ত হই…
তবুও প্রেম কিছুতে মানে না পরাভব…… যতবার পরাজয়………ততবার কয়
আমি ভালোবাসি যারে সেকি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে
তোমার চিঠি কে খুব ভালোবাসি তার চেয়ে ও বেশি ভালোবাসি তোমাকে
পারী,
তোমার ভালোবাসার ছোঁয়া আমার জীবনে অনেক পরিবর্তন এনেছে, আমার জীবনের মানেই বদলে দিয়েছো তুমি। এখন আর আগের মতো জীবন নিয়ে এতোটা হতাশা জাগে না, জীবনকে ভালোবাসি তোমাকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই।
তোমাকে ছেড়ে কখনও দূরে কোথাও যাবার প্রশ্ন তো হয় না তোমাকে নিয়েই যাবো।
তোমার ভালোবাসা পাবার জন্যই যে আকুল হয়ে থাকি…… আরও আকুল হয়ে থাকি তোমার চিঠির জন্য। তুমি যে কতো মজা করে চিঠি লেখো, এখন তো মনে হচ্ছে তোমার একটা ব্লগ থাকলে বেশ মজা হতো।
আহেম আহেম, কিছু একটার গন্ধ পাচ্ছি!!!
@দাদু শুধু গন্ধ নিয়ে অপেক্ষা করো না স্বাদও নিয়ো, কারও প্রেমে পরে যাও
খুব ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে লেখাটা একান্তই নিজের জন্য লেখা। বলতে বাঁধা নেই, কিছু সময়ের জন্য রোমান্টিসিজমে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলাম
চমৎকার! রুমান্টিসিজম ভালু পাই!
আপনার ব্লগের সিম্পলিস্টিক লেআউটটা ভালো লাগল।